বাংলা নামের ইতিহাস::

‘বাংলা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ জানা না গেলেও ধারনা করা হয় যে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীয় ভাষা থেকে “বঙ” বা “বঙ্গ” শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। অন্য মতাবলম্বীরা ধারণা করেন যে বাংলা শব্দটি অস্ট্রিক ভাষার ‘বোঙ্গা’ শব্দটি থেকে এসেছে যার অর্থ সূর্য-দেবতা। মহাভারত ও পুরাণ অনুসারে বঙ্গ শব্দটি এসেছে পৌরাণিক রাজা বলির পুত্রের নামানুসারে যিনি বঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংস্কৃত ভাষার বিবিধ গ্রন্থাদিতে বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার কিছু অংশ উপবঙ্গ রূপেও পরিচিত ছিল।

‘বাঙ্গালা’ শব্দ থেকে বাংলা শব্দের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে কারণ মধ্যযুগে এ অঞ্চল বুঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহার করা হতো। বাংলার সুলতানদের বাঙ্গালার শাহ বলে ডাকা হ্তো। মুঘলরা তাদের বাংলা প্রদেশকে সুবাহ-ই-বাংলা বলে উল্লেখ করত ।

বাংলার প্রাচীন ইতিহাস:

২০০০০ বছর পূর্বের প্রস্তর যুগের এবং প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো তাম্রযুগের ধ্বংসাবশেষ বাংলায় পাওয়া গেছে।

ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে । এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল । অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে । মহাভারতে পৌন্ড্র রাজ বাসুদেব এর উল্লেখ পাওয়া যায় । এছাড়া চেদি রাজ‍্য আধুনা ভাওয়াল এর কাছে অবস্থিত । মগধরাজ জরাসন্ধ মহাপরাক্রমশালী নৃপতি ছিলেন। মহাভারতে পাওয়া যায় চিত্রসেন ও সমুদ্রসেন ভীমের দিগ্বিজয় আটকে দিয়েছিল । এরা বঙ্গের অতি পরাক্রমশালী নৃপতি ছিলেন ।খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলই শক্তিশালী রাজ্য মগধের অংশ ছিল ।।

বাংলার ইতিহাস বলতে অধুনা বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের বরাক উপত্যকার বিগত চার সহস্রাব্দের ইতিহাসকে বোঝায়।গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ এক অর্থে বাংলাকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের ইতিহাসে বাংলা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। প্রাচীন রোমান ও গ্রিকদের কাছে এই অঞ্চল গঙ্গারিডাই নামে পরিচিত ছিল। চার সহস্রাব্দ পূর্বে বাংলায় সভ্যতার ক্রমবিকাশ শুরু হয়।প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ভাষায় এই অঞ্চলকে গঙ্গারিডই নামে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বাংলা সর্বদাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রাচীন বাংলা কয়েকটি জনপদে বিভক্ত ছিল।।।

প্রাচীন বাংলার জনপদ::প্ৰাচীনযুগে বাংলা নামে কোনো অখণ্ড রাষ্ট্ৰ ছিল না। বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন বঙ্গ, পুণ্ড্ৰ, গৌড়, হরিকেল, সমতট, বরেন্দ্ৰ এরকম প্ৰায় ১৬টি জনপদে বিভক্ত ছিল।বাংলার বিভিন্ন অংশে অবস্থিত প্ৰাচীন জনপদগুলোর সীমা ও বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। কেননা বিভিন্ন সময়ে এসব জনপদের সীমানা হ্ৰাস অথবা বৃদ্ধি পেয়েছে।বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে প্ৰাচীনতম হলো পুণ্ড্ৰ।

প্রাচীন জনপদের নাম এবং তাদের বর্তমান অবস্থান::

১.পুণ্ড্র ::

বৃহত্তর বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অংশ বিশেষ

২.বরেন্দ্ৰ:: বগুড়া,পাবনা, রাজশাহী বিভাগের উত্তর পশ্চিমাংশ, রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অংশ

৩.বঙ্গ::ঢাকা, ফরিদপুর, বিক্রমপুর, বাকলা (বরিশাল)

৪.গৌড়:: মালদহ , মুর্শিদাবাদ,বীরভূম,বর্ধমান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ

৫.সমতট::বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল

৬.রাঢ়::পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল বর্ধমান জেলা

৭.হরকূল বা হরিকেল:: চট্টগ্ৰাম, পার্বত্য চট্ৰগ্ৰাম, ত্ৰিপুরা, সিলেট

৮.চন্দ্ৰদ্বীপ:: বরিশাল, বিক্ৰমপু্‌র, মুন্সীগঞ্জ জেলা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল

৯.সপ্তগাঁও:: খুলনা এবং সমুদ্ৰ তীরবর্তী অঞ্চল

১০.কামরূপ:: জলপাইগুড়ি, আসামের বৃহত্তর গোয়ালপাড়া জেলা,বৃহত্তর কামরূপ জেলা

১১.তাম্ৰলিপ্ত:: মেদিনীপুর জেলা

১২.রূহ্ম (আরাকান):: কক্সবাজার, মায়ানমারের কিছু অংশ, কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণা অঞ্চল

১৩.সূহ্ম:: গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম তীরের দক্ষিণ ভূভাগ,আধুনিক মতে বর্ধমানের দক্ষিণাংশে, হুগলির বৃহদাংশ, হাওড়া এবং বীরভূম জেলা নিয়ে সূহ্ম দেশের অবস্থান ছিল

১৪.বিক্রমপুর:: মুন্সিগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল

১৫.বাকেরগঞ্জ:: বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট

👉গৌড় রাজ্য::

বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন শশাঙ্ক যিনি ৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। সম্ভবত তিনি গুপ্ত সম্রাটদের অধীনে একজন সামন্তরাজা ছিলেন । তার রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। হর্ষবর্ধনের ভ্রাতা রাজ‍্যবর্ধনকে ইনি হত‍্যা করেন। এই জন‍্য হর্ষবর্ধন-এর সঙ্গে তার যুদ্ধ হয় । তার শক্তি বৃদ্ধি হতে দেখে কামরুপ রাজ ভাস্করবর্মন তার শত্রু হর্ষবর্ধনের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন । শশাঙ্ক চালুক‍্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর সাহায‍্য পেয়েছিলেন এদের বিরুদ্ধে।শশাঙ্ক পরম শৈব ও বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন। পাটলীপুত্র ও কুশীনগরে বহু বৌদ্ধকীর্তি ধ্বংস করেন। ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে শশাঙ্ক-এর মৃত্যুর পর তার রাজ্যের পতন ঘটে। শশাঙ্ক‌ই প্রথম বাংলার রূপরেখা দিয়েছিলেন।

মাৎস্যন্যায়::

৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে এক ঘোরতর নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। যা প্রায় দেড়শো বছর স্থায়ী হয় ।এই সময় বাংলাতে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সৃষ্টি হয়। আত্মকলহ,গৃহযুদ্ধ,গুপ্তহত্যা,অত্যাচার প্রভৃতি চরমে ওঠে ।বাংলার সাধারণ দরিদ্র মানুষের দুর্দশার শেষ ছিল না ।

স্থায়ী প্রশাসন না থাকাতে বাহুবলই ছিল শেষ কথা।বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় অভিজাততন্ত্র এই সময় প্রভাবশালী লোকেদের সভা “প্রকৃতপুঞ্জ” গোপাল নামের এক রাজাকে নির্বাচন করেন, তিনি মাৎস্যন্যায় এর পতন ঘটান।

পাল বংশ ::

পাল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ধ্রুপদি যুগের একটি সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের উৎসস্থল ছিল বাংলা অঞ্চল। পাল সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয় এই সাম্রাজ্যের শাসক রাজবংশের নামানুসারে। পাল সম্রাটদের নামের শেষে ‘পাল’ অনুসর্গটি যুক্ত ছিল। প্রাচীন প্রাকৃত ভাষায় এই শব্দটির অর্থ ছিল ‘রক্ষাকর্তা’। পাল সম্রাটেরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ের সম্রাট পদে গোপালের নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে এই সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে। অধুনা বাংলা ও বিহার ভূখণ্ড ছিল পাল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই সাম্রাজ্যের প্রধান শহরগুলি ছিল পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী (বরেন্দ্র), মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দল।

গোপাল::

মাৎস্যন্যায়ের সময় বাংলার বিশৃঙ্খলা দমনের জন্য বাংলার মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে গোপাল নামক এক সামন্তরাজাকে বাংলার রাজা রূপে গ্রহণ করেন ।গোপালই হলেন পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা ।পাল বংশের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই রাজা ছিলেন ধর্মপাল (রাজত্বকাল ৭৭৫-৮১০ খ্রীষ্টাব্দ) এবং দেবপাল (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) । পাল বংশের স্থায়ীত্বকাল ছিল প্রায় ৪০০ বছর।পাল বংশের অন‍্য উল্ল‍্যেখ যোগ‍্য রাজা ছিলেন নারায়ণপাল ৮৬০-৯১৫ , মহীপাল ৯৭৮-১০৩০, রামপাল। তাঁর শাসনকালে শিল্প কলায় বাংলা শিখরে উঠে । কিন্তু এই সময় বহু ব্রাহ্মণ বৌদ্ধ অত‍্যাচারে বাংলা ত‍্যাগ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে চলে যায় ।

ধর্মপাল ::

গোপালের সাম্রাজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটান তার পুত্র ধর্মপাল ও পৌত্র দেবপাল। প্রথম দিকে প্রতিহার শাসক বৎসরাজার হাতে ধর্মপাল পরাজিত হয়েছিলেন। পরে রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব ধর্মপাল ও বৎসরাজা দুজনকেই পরাজিত করেন। ধ্রুব দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে ফিরে গেলে ধর্মপাল উত্তর ভারতে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তিনি কনৌজের ইন্দ্রায়ুধকে পরাজিত করেন এবং কনৌজের সিংহাসনকে নিজের নির্বাচিত চক্রায়ুধকে স্থাপন করেন। উত্তর ভারতের আরও কয়েকটি ছোটো রাজ্য ধর্মপালের আধিপত্য স্বীকার করে নেয়। কিছুকাল পরেই বৎসরাজার পুত্র দ্বিতীয় নাগভট ধর্মপালের রাজ্যবিস্তার পর্যবেক্ষণ করতে আসেন। তিনি কনৌজ জয় করেন এবং চক্রায়ুধকে বিতাড়িত করেন। এরপর দ্বিতীয় নাগভট মুঙ্গের পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং একটি আকস্মিক যুদ্ধে ধর্মপালকে পরাজিত করেন। ধর্মপাল আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং রাষ্ট্রকূট সম্রাট তৃতীয় গোবিন্দের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। তৃতীয় গোবিন্দ উত্তর ভারত আক্রমণ করে দ্বিতীয় নাগভটকে পরাজিত করেন। রাষ্ট্রকূট নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, চক্রায়ুধ ও ধর্মপাল দুজনেই রাষ্ট্রকূট আধিপত্য স্বীকার করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় গোবিন্দ দাক্ষিণাত্যে ফিরে গেলে ধর্মপাল উত্তর ভারত নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি ‘পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

দেবপাল:

ধর্মপালের পর তার পুত্র দেবপাল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তাকে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী পাল শাসক মনে করা হয়। তিনি প্রাগজ্যোতিষ (অধুনা অসম) ও উৎকল (অধুনা ওড়িশা) আক্রমণ করেছিলেন। প্রাগজ্যোতিষের রাজা বিনাযুদ্ধেই তার কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং উৎকলের রাজ্য রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান। তার উত্তরসূরিদের দ্বারা উৎকীর্ণ লিপিগুলিতে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি আরও কিছু অঞ্চল জয় করেছিলেন।

রাজ্যপাল ও নারায়ণপাল::

দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে। দেবপালের ভ্রাতুষ্পুত্র বিগ্রহপাল অল্প কিছুকাল রাজত্ব করার পর সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। বিগ্রহপালের পুত্র তথা উত্তরসূরি নারায়ণপাল ছিলেন একজন দুর্বল শাসক। তার রাজত্বকালে রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষ পালদের পরাজিত করেন। পালেদের পতনের সুযোগ নিয়ে অসমের রাজা হরজর সম্রাট উপাধি গ্রহণ করেন এবং শৈলোদ্ভব রাজবংশ ওড়িশা অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে।

নারায়ণপালের পুত্র রাজ্যপাল অন্তত ১২ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি কয়েকটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও সুদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করান। তার পুত্র দ্বিতীয় গোপাল কয়েক বছর রাজত্ব করার পরই বাংলার উপর থেকে আধিপত্য হারান এবং তারপর শুধুমাত্র বিহার অঞ্চল শাসন করেন। পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় বিগ্রহপালকে চান্দেল ও কলচুরি আক্রমণ সহ্য করতে হয়। তার রাজত্বকালে পাল সাম্রাজ্য গৌড়, রাঢ়, অঙ্গ ও বঙ্গ প্রভৃতি ছোটো ছোটো রাজ্য বিভাজিত হয়ে যায়। হরিকেলের (পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা) কান্তিদেব ‘মহারাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং এবং একটি পৃথক রাজ্য স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে চন্দ্র রাজবংশ এই রাজ্যটি শাসন করেছিল। কম্বোজ পাল রাজবংশ গৌড় রাজ্যটি (পশ্চিম ও উত্তর বাংলা) শাসন করত। এই রাজবংশের শাসকেরা নামের শেষে ‘-পাল’ উপসর্গটি ব্যবহার করতেন (যেমন রাজ্যপাল, নারায়ণপাল ও নয়পাল)। এই রাজবংশের উৎসটি অজ্ঞাত। তবে এই ব্যাপারে সর্বাধিক যুক্তিগ্রাহ্য মতটি হল, কোনও এক পাল আধিকারিক রাজধানী সহ পাল সাম্রাজ্যের একটি বৃহৎ অংশের ক্ষমতা হস্তগত করে এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

প্রথম মহীপালের রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা ::

প্রথম মহীপাল ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার তিন বছরের মধ্যেই তিনি উত্তর ও পূর্ব বাংলা পুনরুদ্ধার করেছিলেন। এছাড়াও তিনি অধুনা বর্ধমান বিভাগের উত্তরাঞ্চলও পুনরুদ্ধার করেছিলেন। তার রাজত্বকালে ১০২১ থেকে ১০২৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চোল সাম্রাজ্যের প্রথম রাজেন্দ্র চোল কয়েকবার বাংলা আক্রমণ করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার জল সংগ্রহ। রাজ্যবিস্তার করতে গিয়ে তিনি একাধিক শাসককে পদানত করতে সক্ষম হন এবং প্রভূত সম্পদ লুণ্ঠন করেন। বাংলার ধর্মপাল, রণসুর ও গোবিন্দচন্দ্রকে প্রথম রাজেন্দ্র চোল পরাজিত করেন। এঁরা সম্ভবত পাল রাজবংশের প্রথম মহীপালের অধীনস্থ সামন্ত শাসক ছিলেন। প্রথম রাজেন্দ্র চোল প্রথম মহীপালকেও পরাজিত করেন এবং পাল রাজার থেকে “দুর্লভ শক্তির হস্তীবাহিনী, নারী ও সম্পত্তি” লাভ করেন। প্রথম মহীপাল উত্তর ও দক্ষিণ বিহারেও আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। সম্ভবত গজনির মামুদের ভারত আক্রমণের ফলে উত্তর ভারতের রাজশক্তিগুলির দুর্বল হয়ে পড়া তাকে এই রাজ্যবিস্তারে সহায়তা করেছিল। তিনি সম্ভবত বারাণসী ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিও জয় করেছিলেন। কারণ, তার ভ্রাতা স্থিরপাল ও বসন্তপাল বারাণসীতে একাধিক ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ ও সংস্কারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে কলচুরি রাজা গাঙ্গেয়দেব অঙ্গের শাসককে পরাজিত করে বারাণসী অধিকার করেন। অঙ্গের এই শাসক সম্ভবত ছিলেন প্রথম মহীপাল।

নয়পাল ও তৃতীয় বিগ্রহপাল ::

প্রথম মহীপালের পুত্র নয়পাল এক দীর্ঘ যুদ্ধের পর কলচুরি রাজা কর্ণকে (গাঙ্গেয়দেবের পুত্র) পরাজিত করেন। পরবর্তীকালে তারা বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশের মধ্যস্থতায় একটি শান্তিচুক্তি সাক্ষর করেন। নয়পালের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে কর্ণ পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু সেবারও তিনি পরাজিত হন এবং সেবারও একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় বিগ্রহপাল কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীকে বিবাহ করেন। পরে চালুক্য রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের হাতে তৃতীয় বিগ্রহপাল পরাজিত হন। ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বাংলা আক্রমণের সময় দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলায় বহু সৈনিক এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এটিই সেন রাজবংশের দাক্ষিণাত্য উৎসের ব্যাখ্যা। ওড়িশার সোমবংশী রাজা মহাশিবগুপ্ত যযাতি ও তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন। এরপরে একাধিক আক্রমণের ফলে পাল সাম্রাজ্যের শক্তি অনেকটাই হ্রাস পায়। তার রাজত্বকালেই বর্মণরা পূর্ব বাংলা অধিকার করেন।

তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্র দ্বিতীয় মহীপাল অল্প কিছুকালের জন্য পালেদের সামরিক গৌরব ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম্‌ গ্রন্থে তার রাজত্বকালের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় মহীপাল তার ভ্রাতা রামপাল ও দ্বিতীয় সুরপালকে কারারুদ্ধ করেছিলেন। তিনি সন্দেহ করেছিলেন, তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এর কিছুকাল পরেই তিনি কৈবর্ত (ধীবর) প্রজাসত্ত্বভোগী গোষ্ঠীপতিদের বিদ্রোহের সম্মুখীন হন। এই অভ্যুত্থান কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে খ্যাত। দিব্য (বা দিব্বক) নামে এক গোষ্ঠীপতি তাকে হত্যা করেন এবং বরেন্দ্র অঞ্চল অধিকার করেন। এই অঞ্চল দিব্যকের উত্তরসূরি রুদক ও ভীমের নিয়ন্ত্রণে থাকে। দ্বিতীয় সুরপাল মগধে পালিয়ে যান এবং অল্প কিছুকাল রাজত্ব করার পর মারা যান। তারপর তার ভ্রাতা রামপাল সিংহাসনে বসে। তিনি দিব্যের পৌত্র ভীমের বিরুদ্ধে একটি প্রধান যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তার মামা মথন (রাষ্ট্রকূট রাজবংশের) এবং দক্ষিণ বিহার ও দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার একাধিক সামন্ত শাসক তাকে সাহায্য করেন। রামপাল শেষ পর্যন্ত ভীমকে পরাজিত করেন এবং তাকে ও তার পরিবারকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন।।

রামপাল কর্তৃক রাজ্য পুনরুদ্ধার::

বরেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ হস্তগত করার পর রামপাল পাল সাম্রাজ্যকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেন। তবে তেমন সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হন না। তিনি নতুন রাজধানী রামাবতী থেকে রাজ্যশাসন করতেন। রামাবতীই পাল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। তিনি করভার হ্রাস করেছিলেন, কৃষিকার্যে উৎসাহ দান করতেন এবং একাধিক জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি কামরূপ ও রাঢ় অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন এবং পূর্ব বাংলার বর্মণ রাজাকে তার আধিপত্য স্বীকার করতে বাধ্য করেন। অধুনা ওড়িশা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ অর্জনের জন্য তিনি তিনি গঙ্গ রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। রামপালের মৃত্যুর পূর্বে গঙ্গরা উক্ত অঞ্চল অধিকার করতে সমর্থ হয়নি। পাল ও চোল সাম্রাজ্যের সাধারণ শত্রু গণ ও চালুক্যদের বিরুদ্ধে সমর্থন জোগাড় করার জন্য রামপাল চোল রাজা কুলোত্তুঙ্গর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। তিনি সেনদের উপর নজর রেখেছিলেন। কিন্তু কর্ণাটকের নান্যুদেব নামক গোষ্ঠীপতির কাছে মিথিলা হারান। গহদবল শাসক গোবিন্দচন্দ্রের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি পাল সাম্রাজ্যকে উক্ত শাসকের আগ্রাসী সমরনীতির হাত থেকে রক্ষা করেন।

পতন::

রামপাল ছিলেন পাল রাজবংশের সর্বশেষ শক্তিশালী শাসক। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র কুমারপালের রাজত্বকালে অসমে একটি বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেয়। বৈদ্যদেব এই বিদ্রোহ দমন করেন। কিন্তু কুমারপালের মৃত্যুর পর বৈদ্যদেব কার্যত একটি পৃথক রাজ্য স্থাপন করেন। রামচরিতম্‌ অনুসারে, কুমারপালের পুত্র তৃতীয় গোপালকে তার কাকা মদনপাল খুন করেন। মদনপালের শাসনকালে পূর্ব বাংলার বর্মণরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ওড়িশায় পূর্ব গঙ্গদের সঙ্গে সংঘাত পুনরায় ঘনীভূত হয়। মদনপাল গহদবলদের কাথ থেকে মুঙ্গের অধিকার করেছিলেন। কিন্তু বিজয়সেন তাকে পরাজিত করে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলা নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ১১৬২ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ গোবিন্দপাল নামে এক রাজা অধুনা গয়া জেলার ভূখণ্ডে রাজত্ব করতেন। কিন্তু পাল সম্রাটদের সনেগ তার কোনও সম্পর্ক ছিল বলে সুদৃঢ় প্রমাণ পাওয়া যায় না। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর সেন রাজবংশ বাংলা শাসন করতে শুরু করে।।

পাল রাজাদের তালিকা::

প্রথম গোপাল (৭৫৭-৭৮১)

ধর্মপাল (৭৮১-৮২১)

দেবপাল (৮২১-৮৬১)

প্রথম বিগ্রহপাল (৮৬১-৮৬৬)

নারায়নপাল (৮৬৬-৯২০)

রাজ্যপাল (৯২০-৯৫২)

দ্বিতীয় গোপাল (৯৫২-৯৬৯)

দ্বিতীয় বিগ্রহপাল (৯৬৯-৯৯৫)

প্রথম মহীপাল (৯৯৫-১০৪৩)

নয়াপাল (১০৪৩-১০৫৮)

তৃতীয় বিগ্রহপাল (১০৫৮-১০৭৫)

দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭৫-১০৮০)

দ্বিতীয় শূরপাল (১০৭৫-১০৭৭)

রামপাল (১০৮২-১১২৪)

কুমারপাল (১১২৪-১১২৯)

তৃতীয় গোপাল (১১২৯-১১৪৩)

মদনপাল (১১৪৩-১১৬২)

 

:: সেন বংশ::

বল্লাল সেন রচিত “অদ্ভুতসাগর” গ্রন্থ অনুসারে সেন রাজবংশ এর গোরাপত্তন ৯০০ শতকেরও পূর্বে ,বাংলার পাল রাজাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে করতে তারা একসময় পাল রাজাদেরকে পরাজিত করে পাল সাম্রাজ্য করায়ত্ত করেন । সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল দক্ষিণ ভারতের অধুনা কর্ণাটকের মহীশূর ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিমলগ্নে পাল রাজবংশের বিশৃঙ্খলতার সুযোগ নিয়ে সেনদের উত্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ অধ্যায়। বাংলার পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র ‘সামন্তচক্রের’ বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ঘটে।

সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল কর্ণাটকের মহীশূর ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে। সেন রাজারা বীর সেনকে তাঁদের বংশের আদিপুরুষ বলে দাবি করেছিলেন। সেনরা ঠিক কোন সময়ে বাংলায় এসেছিলেন, তা জানা যায় না। তবে এটুকু জানা যায় যে, সামন্ত সেনই প্রথম বাংলায় এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। তবে ঐ সময় স্থানীয় রাজার দারুন আধিপত্য ছিল।

সেন রাজাদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তাঁরা ছিলেন চন্দ্রবংশীয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’। যাঁরা ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণ করে একই সাথে ব্রাহ্মণ্য আচার এবং ক্ষত্রিয়ের পেশা রাজ্যশাসন ও যুদ্ধবিদ্যা অনুশীলন করে তাকে “ব্রহ্মক্ষত্রিয়” বলে।সেনদের জীবনাচরণে এর প্রভাব দৃশ্যমান।তারা যেমনি ছিলেন রাজ্যশাসন আর অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী তেমনি শাস্ত্র বিদ্যায়ও সিদ্ধহস্ত।রচণা করেছেন দানসাগর অদ্ভুতসাগরের মত গ্রন্থাবলি। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সেনরা প্রথমে জৈন আচার্য বংশোদ্ভূত ছিলেন। পরে শৈবধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু এই মত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতালাভ::

দেবপাল থেকে মদনপাল পর্যন্ত পালরাজাদের লেখনি থেকে জানা যায়, তাঁরা অনেক সময় বিদেশি কর্মচারীদের প্রশাসনিক কাজকর্মে নিযুক্ত করতেন। অনুমিত হয়, সেই সময়েই সেনরা বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন।সামন্ত সেনের নামের সাথে কোন রাজা সূচক কোন উপাধি পাওয়া যায় নি। তাই বলা যায় যে সামন্ত সেন বাংলার কোন শাসন ক্ষমতায় ছিলেন না। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন তিনি পাল রাজাদের কোন মহা সামন্ত ছিলেন। পরে পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁরা বাংলার সিংহাসন দখল করেন।

 

সেন রাজবংশের সূচনা::

বাংলায় সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেন সামন্ত সেন। তিনি বর্ধমান অঞ্চলে বাস করতেন। সামন্ত সেন অবশ্য রাজা উপাধি ধারণ করেননি। তাঁর পুত্র হেমন্ত সেন স্বাধীন সেন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে প্রথম ‘মহারাজা’ উপাধি ধারণ করেন।

বিজয় সেন (১০৯৫-১১৫৮ খ্রিস্টাব্দ) ::

হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন ক্ষুদ্র সেন রাজ্যকে একটি বিরাট সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। ‘বারাকপুর তাম্রপট্ট’ ও ‘দেওপাড়া লেখ’ থেকে বিজয় সেন সম্পর্কে নানা তথ্য জানা যায়। বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গের এক শূরবংশীয় রাজকন্যাকে বিয়ে করে বর্ধমান অঞ্চলে নিজের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেন। তিনি উড়িষ্যার রাজা অনন্তবর্মন চোড়গঙ্গের সঙ্গে মিত্রতা করেন এবং সমগ্র রাঢ়ে নিজের একাধিপত্য স্থাপন করেন। বিজয় সেন মিথিলার নান্যদেব, গৌড়রাজ মদন পাল ও কোশাম্বীর সামন্তরাজা দ্বোরপবর্ধনকেও পরাজিত করেছিলেন। ভোজবর্মণকে পরাজিত করে বিজয় সেন পূর্ববঙ্গ জয় করেন। এছাড়া কলিঙ্গ ও মগধের কিয়দংশও তিনি জয় করেছিলেন।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে বিজয় সেনের রাজত্বকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনিই ছিলেন সেন রাজবংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য শাসক। তিনি সমগ্র রাঢ়, গৌড়, মিথিলা ও পূর্ববঙ্গ জয় করেছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলার রাষ্ট্রীয় ঐক্য ভেঙে গিয়েছিল। বিজয় সেন পুনরায় বাংলাকে রাষ্ট্রগতভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

বল্লাল সেন (১১৫৮-১১৭৯ খ্রিস্টাব্দ)::

বিজয় সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বল্লাল সেন বাংলার সিংহাসনে বসেন। বল্লাল সেন মগধ ও মিথিলা জয় করেছিলেন। তাঁর রাজ্য পূর্বে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমে মগধ, উত্তরে দিনাজপুর থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। দিনাজপুরের পাথরঘড়ার বল্লালদিঘি, বিক্রমপুরের বল্লালবাড়ি আজও তাঁর স্মৃতি বহন করছে। বল্লাল সেনের রাজত্বকাল সম্পর্কে জানা যায় ‘নৈহাটি তাম্রপট্ট’, বিজয় সেনের ‘দেওপাড়া লেখ’, বল্লাল সেন রচিত ‘অদ্ভুত সাগর’ ও ‘দানসাগর’ গ্রন্থ, ও আনন্দভট্ট রচিত ‘বল্লালচরিত’ গ্রন্থ থেকে।

বল্লাল সেন পাল রাজাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হেনেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে বাগড়ি অঞ্চল (সুন্দরবন ও মেদিনীপুর) সেন সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল। বল্লাল সেন চালুক্য রাজকন্যা রমাদেবীকে বিয়ে করেছিলেন।

অনেকের মতে বল্লাল সেন বাংলায় কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এই তথ্য অস্বীকার করেছেন। বল্লাল সেন ধর্ম ও সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। বেদ, স্মৃতি ও পুরাণে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি তান্ত্রিক হিন্দুধর্মেরও অনুরাগী ছিলেন। শেষ জীবনে পুত্র লক্ষ্মণ সেনের হাতে শাসনভার তুলে দিয়ে ত্রিবেণীর কাছে গঙ্গাতীরে শাস্ত্রচর্চায় শেষ জীবন অতিবাহিত করেছিলেন।

লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯-১২০৭)::

গোবিন্দপুর (চব্বিশ পরগনা), আনুলিয়া (নদিয়া), তপনদিঘি (দিনাজপুর), মাধাইনগর (পাবনা), শান্তিপুর (মুর্শিদাবাদ), ভাওয়াল (ঢাকা) ও সুন্দরবন অঞ্চলে লক্ষ্মণ সেন সম্পর্কে অনেকগুলি তাম্রলিপি পাওয়া গিয়েছে। মিনহাজউদ্দিন সিরাজের ‘তবকৎ-ই-নাসিরি’ ও ইসামির ‘ফুতুহ্-অউস-সালাতিন’ বইয়েও লক্ষ্মণ সেন সম্পর্কে অনেক কথা জানা যায়। মিনহাজউদ্দিন লিখেছেন, লক্ষ্মণ সেন ৬০ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন এবং গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ করেন। কথিত আছে, লক্ষ্মণ সেন পুরী, কাশী ও এলাহাবাদে বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন। তিনি তাঁর পিতার রাজ্যসীমা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। লক্ষ্মণ সেন কনৌজের গাড়োয়ালবংশীয় রাজাকে পরাজিত করেছিলেন এবং গয়া অধিকার করেছিলেন। তিনি বাংলার বাইরেও একাধিক সামরিক অভিযান প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে বাংলা উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছিল। ১১৯৬ সালে সুন্দরবনের একাংশের প্রজাগণ তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। মহারাজাধিরাজ শ্রী কোম্মনপাল এখানে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বল্লাল সেনের মতো লক্ষ্মণ সেনও বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। ‘গীতগোবিন্দম্’ রচয়িতা জয়দেব, ‘পবনদূত’ রচয়িতা ধোয়ী, ‘ব্রাহ্মণসর্বস্ব’ রচয়িতা হলায়ূধ তাঁর সভাসদ ছিলেন। লক্ষ্মণ সেন নিজেও কয়েকটি শ্লোক রচনা করেছিলেন। তিনি ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি ধারণ করেন। তিনি দানশীল রাজা ছিলেন বলে জানা যায়।

পতন::

১২০৬ সালে মহম্মদ ঘোরি দিল্লিতে তুর্কি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগেই ১২০২ সালে তুর্কি সামরিক নেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলা আক্রমণ করেন। এর কিছুদিন আগে লক্ষ্মণ সেন নদিয়ায় অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। নদিয়া তুর্কিদের দ্বারা আক্রান্ত হলে বৃদ্ধ লক্ষ্মণ সেন বাধা না দিয়ে নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান। নদিয়া তুর্কি শাসনে চলে যায়। তবে লক্ষ্মণ সেন পূর্ববঙ্গ থেকে শাসনকাজ চালিয়ে যান। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র মাধব সেন প্রথমে বাঙ্গালার রাজা হইয়েছিলেন । তৎপরে তার ভ্রাতা কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেন পর পর বাঙ্গালার রাজা হয়েছিলেন। তিনি ১২২৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। বিশ্বরূপ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সূর্য সেন রাজা হয়েছিলেন। তবে লক্ষ্মণ সেনের মৃত্যুর পর থেকেই বাংলায় সেন শাসন দুর্বল হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে সামন্ত বিদ্রোহের ফলে সেন রাজ্যের পতন ঘটে।

সংগৃহীত অনলাইন

আপনার মতামত দিন